হাফিজের স্বপ্ন

অমা যামিনীর গহন আঁধারে চুপি চুপি এল প্রিয়া,
দ্বিগুণ আঁধার খর্জুর-বীথি, তাহারি আড়াল দিয়া!
আঙুরের মতো অলকগুচ্ছে গোলাবের মালা পরি,
মৃদু উশীরের মদির গন্ধে নিশীথ আকাশ ভরি,

কাজল উজল কালাে কটাক্ষে হানিয়া বিজলি হাসি,
ফিরােজা রঙের বসন পরিয়া শিখানে দাঁড়াল আসি;—
বীণানিন্দিত মধুর কণ্ঠে কহিল—রে অনুরাগি,
শূন্য শয়নে আমারে মাগিয়া জাগিয়া কিসের লাগি?

করুণা তাহার হৃদয়ে হানিল সুখের মতন ব্যথা,
যুড়ি জোড় পাণি বিগলিত বাণী, কষ্টে কহিনু কথা,—
তব অঞ্চল বসন্ত বায়ে হদয়ে যে ফুল ফুটে,
তব মঞ্জীর সঙ্গীতরবে হৃদয়ে যে ধ্বনি উঠে,—

তাহারি গন্ধে, তাহারি ছন্দে রচিয়া গজল গীতি
তােমারি কুঞ্জ দুয়ারে গাহিয়া শুনাইব নিতি নিতি;
নাহি চাই খ্যাতি, যশে কাজ নাই, চাহিনাকো ধন মান,
তােমার স্তবের যােগ্য করিয়া শিখাইয়া দাও গান।

না কহিয়া কথা, না বলিয়া কিছু—লীলায়িত হেলাভরে
সেতারটি শুধু লইল টানিয়া কোমল বুকের ‘পরে;
অঙ্গুলি ঘাতে তারগুলি তার সঙ্গীতে ভরি দিয়া
আমার কোলের সঙ্গীটি মােরে ফিরাইয়া দিল প্রিয়া।

গােলাবের কুঁড়ি তখনাে ভাবেনি ফুটিতে হইবে কিনা,
ডানার মাঝারে মাথাটি গুঁজিয়া চাতকী চেতনাহীনা;—
অমা যামিনীর গভীর আঁধারে মিলাইয়া গেল প্রিয়া—
শিশির-শীতল খর্জুর-বীথি, তাহারি ভিতর দিয়া!

তারপর হতে বাজিছে সাহানা সােহিনী সিন্ধু কাফি—
তারি সাথে সেই পরম পরশ উঠিতেছে কাঁপি কাঁপি—
তালে তালে উঠে দুলে দুলে তারি হৃদয়েরি আকুলতা,
সুরে সুরে সদা ঘুরে ঘুরে ফিরে তাহারি গােপন কথা!