অন্ধকার

অন্ধকার, ওগাে অন্ধকার!
অসীমের রাজপাটে একেশ্বরী অয়ি বন্ধদ্বার,
নিবিড় নিকষ তব ঘনকৃষ্ণ চিকুরের তলে,
নিখিল উদাস-করা কালাে চোখে যে মানিক জ্বলে—
নিশীথ বিরলে
কোনােদিন কারাে কাছে মিলিল না সন্ধান তাহার—
ব্যর্থ বসুধার,
অয়ি অন্ধকার!

বিদেশিকা হে অন্তঃপুরিকা,
চিরদিন উপেক্ষিছ আলােকের অন্ধ অহমিকা
দর্শন হইল অন্ধ, বিজ্ঞানের হলো জ্ঞান হারা,
ধ্যানের স্তিমিতনেত্রে অঝােরে ঝরিল বারিধারা,
খুঁজিয়া কিনারা;
ভাষার আভাসপাতে আঁকিবারে তব রূপচ্ছবি
চাহে মুগ্ধ কবি!

বিশ্বজয়ী অয়ি একেশ্বরী,
তােমার তিমির দুর্গে জাগে ভয়—সতর্ক প্রহরী!
দ্বারে দ্বারে অজানার আতঙ্কেতে যাত্রী সব,
পথে পথে অচেনার আশঙ্কার আর্ত কলরব—
ভীষণ-ভৈরব;
কুহুনিশীথিনী তার কাকপক্ষ অন্ধ পাখা দিয়া
রাখে অগিলিয়া!

হে অজানা—ওগাে অন্ধকার,
যা-কিছু জানি বা চিনি, তারাে মর্মে তব অধিকার!
খনিগর্ভে গিরিগর্ভে বনমধ্যে সমুদ্রের জলে
তােমার বিজয়-চিহ্ন প্রতি ছত্রে আঁকা ধরাতলে—
সর্ব জলস্থলে
সীমা নাই শেষ নাই বাধা নাই—বসুন্ধরা কাঁপে
তােমার প্রতাপে!

হে অচেনা, হে চির অজানা!
মানবের মনােমাঝে কে খুঁজিবে তােমার ঠিকানা?
কোথা ফুটে প্রেমপুষ্প কোন সে নিভৃত অন্তরালে,
কোথা ছুটে গন্ধ তার কোন রস-রহস্য-পাতালে,
কোন সন্ধ্যাকালে;
চিত্তকুহরের ফাঁকে পাকে-পাকে কত হিংসাবিষ
ফুঁসে অহর্নিশ!

তমােময় তােমার আলয়ে
সূর্য চন্দ্র কোনাে দিন দৃষ্টি তার হানে নাকো ভয়ে;
প্রগলভের অন্তরালে রচিয়াছ তব রাজধানী,
ত্রিলােক জোগায় নিত্য নিদ্রারূপে পরাভব মানি
রাজকর খানি;
মরণ-তােরণ-দ্বারে ডাক যারে, সেই শুধু যায়
তব পদচ্ছায়!

রঙ্গময়ি হে অবগুন্ঠিতা!
তুমি কিন্তু ত্রিভুবনে হের নিত্য চির অকুণ্ঠিতা;
বন্ধ বাতায়ন পথে অপরূপ কালাে ভুরু হানি
বাসনার হাত হতে খসাও উদ্ধত অসিখানি,
ওগো মহারানি;
লালসার বক্রদৃষ্টি নিবে তব সংক্ষুব্ধ নিশ্বাসে,
মৌন অট্টহাসে!

হে নিঃসঙ্গ, তবু ভাবি মনে—
তােমারও ঈপ্সিত বুঝি আছে কেহ সুদূর ভুবনে!
বিরহ-বেদনা যার ধূমাঙ্কিত বাসনার ধূপে,
ছাপিয়া হৃদয় তব চিররাত্রি জ্বলে কালোরূপে,
তমিস্রার স্তূপে;
একবেণীধরা তুমি জাগ নিত্য নিশীথ শয়নে
বিনিদ্র নয়নে!

হে ব্যথিতা, হে অপরিচিতা,
তব রুক্ষ কটাক্ষেতে নিবে আয় দিবসের চিতা;
সখী রাত্রি একা যাত্রী তােমার গহন কুঞ্জবনে
অপরাজিতায় ঘেরা, কোকিলের মৌন আলিম্পনে
জাগে তব সনে;
তোমার বাঞ্ছিত সঙ্গী মৃত্যুঞ্জয় সর্বভয়হারা
যােগে আত্মহারা!

হে শঙ্করি, হে প্রলয়ঙ্করি,
তবু বর দেহ দেবী, এ জীবনে তােমারেই বরি।
জীবনের পূর্বপারে তুমি ছাড়া কে ছিল মা আর?
মাঝে দুদিনের সেতু, আছ তুমি ঘেরি পরপার,
হে চির-আঁধার;
তােমার অনন্ত রূপ চিনিবারে এ মর জীবনে
দীপ্তি এ নয়নে!

ওগাে মাতা, ওগো অন্ধকার!
আলােকের অন্ধ শিশু—অক্ষমের লহ নমস্কার;
কী ভাবে তােমারে ডাকি, শ্যামশ্যামা—
তাই গড়ি মনে
তােমার অরূপ রূপ বাঁধিবারে সীমার বন্ধনে
চাই প্রাণপণে!
অতুল সে কালোরূপে, ছায়াছবি তব প্রতিমার,
নমি বারম্বার,
অয়ি অন্ধকার!