বোধ

আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়,—কোন্‌ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়,—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি পারি না তারে এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাজ তুচ্ছ মনে হয়,—পন্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।

সহজ লােকের মতাে কে চলিতে পারে!
কে থামিতে পারে এই আলােয় আঁধারে
সহজ লােকের মতাে; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর,—কোনাে নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?—শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর?—প্রাণের আহ্লাদ
সকল লােকের মতাে কে পাবে আবার!
সকল লােকের মতাে বীজ বুনে আর
স্বাদ কই!-ফসলের আকাক্সক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলাের দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ‘পরে?
স্বপ্ন নয়,—শান্তি নয়, কোন্‌ এক বােধ কাজ করে
মাথার ভিতরে।

পথে চ’লে পারে—পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতাে ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতাে ঘােরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে;
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে?

আমি থামি,—
সে-ও থেমে যায়;

সকল লােকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁ ধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতাে হ’য়ে,—
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিম্বা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিম্বা যারা পৃথিবীর বীজক্ষেতে আসিতেছে চলে
জন্ম দেবে—জন্ম দেবে বলে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি?—তাহাদের মন
আমার মনের মতাে না কি? –
—তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী!

হাতে তুলে দেখি নি কি চাষার লাঙল?
বাল্‌টিতে টানিনি কি জল?
কাস্তে হাতে কতবার যাইনি কি মাঠে?
মেছােদের মতাে আমি কত নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি;
পুকুরের পানা শ্যাওলা-আঁশ্টে‌ গায়ের ঘ্রাণ গায়ে
গিয়েছে জড়ায়ে;
—এই-সব স্বাদ;
—এ-সব পেয়েছি আমি;—বাতাসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন,
নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন
একদিন;
এই সব সাধ
জানিয়াছি একদিন,—অবাধ—অগাধ;
চলে গেছি ইহাদের ছেড়ে;—
ভালােবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা ক’রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা ক’রে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;

আমারে সে ভালােবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা ক’রে চ’লে গেছে—যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালােবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিল একদিন,—এই ভালােবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা ক’রে গেছি; যে নক্ষত্র-নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বার-বার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালােবাসা—ধুলাে আর কাদা—।

মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়—প্রেম নয়—কোনাে এক বােধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে,
আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতাে ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনােদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবেনা কি? পাবে না আহ্লাদ
মানুষের মুখ দেখে কোনােদিন!
মানুষীর মুখ দেখে কোনােদিন!
শিশুদের মুখ দেখে কোনােদিন!

এই বােধ—শুধু এই স্বাদ
পায় সে কি অগাধ—অগাধ!
পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ
চায় না সে?—করেছে শপথ
দেখিবে সে মানুষের মুখ?
দেখিবে সে মানুষীর মুখ?
দেখিবে সে শিশুদের মুখ?
চোখে কালাে শিরার অসুখ,
কানে যেই বধিরতা আছে,
যেই কুঁজ—গলগণ্ড মাংসে ফলিয়াছে
নষ্ট শসা—পঁচা চালকুমড়ার ছাঁচে,
যে সব হৃদয়ে ফলিয়াছে
—সেই সব।