কুয়াশার চশমায়

কুয়াশার চশমায় ভ’রে উঠে পৃথিবীরে ঢের পিছে ফেলে
হৃদয় পালাতে চায়- তবু তারা পৃথিবীর- পাবে, বলো, কোন সমাশ্রয়
তুমি যদি তাহাদের ছেড়ে যাও অনুভূতি-জারিত হৃদয়
তুমি যদি স্বপ্ন সব নক্ষত্রের শীর্ষে ফেল ঢেলে
যারা বলে পৃথিবীতে স্বপ্নের নাই প্রয়োজন
তাহারা আমারে ছুটি দিত অবহেলে
যদিও ছুটির তরে উজ্জ্বল নয় আজ মন।

এ-পৃথিবী হারায়েছে যেন তার ধূসর প্রতিভা
সেই সব দীর্ঘ মোম নাই আর- যাদের আলোয় ব’সে- ঢের ক্লান্ত হলে
সারা-রাত বসা যেত- সঙ্গে লয়ে এক তাল কল্পনার বিভা
প্যাগোডার পাখি গেছে সমুদ্রের অন্ধকারে চ’লে
কর্নিশের শান্তি পেতে দেখেছি চড়ুই আর আসে না সরমে
মানুষের চোখ তারে আজ ভোরে চায় না ক’ ব’লে
প্রকৃতি মানুষগন্ধহীন যেন হয়ে গেছে ক্রমে।

যখন শৈশব ছিল আমাদের- মনে আছে- শ্রাবস্তীর মতো সব অসম্ভব রাত
এখানে দুয়ারে এসে দেখা দিত- সবুজ ঘাসের গন্ধে আকীর্ণ নিবিড় সম্ভাবনা
শীর্ণ দীর্ঘ শিষ্যা এক এখানে কুটিরে এসে করিত আঘাত
পিতামহদের মুখে ম্লান খড়ি ছিল, তবু আর-এক দ্যোতনা
দেখিয়াছি,- ধীরে-ধীরে পেতেছিল সব যেন শান্ত সমন্বয়
শিশিরের পাখিদের- নক্ষত্রের- ধূসর ধুলোর কণা
প্রেম হতে পারে- পারে ইলেকট্রোন;- হয়ে আছে রক্ত নিঃসংশয়

সোনার ডিমের মতো মুখ এক- ঐখানে- প্রাচীরের পাশে
আকাশের চাঁদ থেকে নেমেছিল- হাতির-দাঁতের মূর্তি জানালার কাছে- জ্যোৎস্নায়
সাদা হাত দিয়ে সে যে খুঁজেছিল- পাখিদের মনীষীরা ডানার সকাশে
স্বাদ আছে, নির্বিঘ্নতা আছে, আছে প্রেম, জেনে অন্ধকার সমুদ্র মাড়ায়
কোথাও রয়েছে উঁচু গাছ আর নীড় জেনে- উঁচু-উঁচু নক্ষত্রের হিত
তবুও টোটার শব্দ সব-চেয়ে ভালো ব’লে সকলেই দু’ হাত বাড়ায়
সব-চেয়ে ভালো লাগে চিন-সাগরের পারে দরজার ও-পারের শীত

মৈত্রেয়ী তো সে-কথাই বলেছিল- ধূসর চশমা হয়ে কুয়াশায় ভাসে তার কথা
সাদা উপনিষদের ঘ্রাণ- রেড়ির আলোকে ম্লান র’বে কত দিন
জাবনার থালা নিয়ে গোরুদের পাশে ছোট ছেলেটির গভীর জড়তা
নাও-না কুড়ায়ে এই ছেলেটিরে- বারুদের মুখে তারে ক’রে দাও শুষ্কতম তৃণ
মেয়েরা কি স্তন দেয় শিশুদের? ঝুল ঝাড়ে? পাট করে?- প্রেমের বিপদে হয় ভীত?
তাহাদের চোখে দাও দানবীর মতো অমসৃণ
প্রমত্ততা;- সঙ্গিন কাঁধে নিয়ে ডাইনোসুর- সরীসৃপে হোক উপনীত।

পৃথিবী কি চেয়েছিল কোনও দিন এই গাঢ়তম অগ্রসর
সাদা মেঘ ভেসে যায় বাংলার থেকে দূর বোম্বাইয়ের দিকে
তার হাতে কাজ নেই- আকাশের প্রিয় প্রেম জানে তাহা- অথচ পাংশুল কাজ অজস্র বন্দর
অগ্রসর শিখাতেছে কল্পনার স্বাদহীন মানবজাতিকে
এক দিন হয়তো-বা নাগার্জুন চেয়েছিল দৃঢ় তৃপ্তি এদেরই মতন
তার আত্মা (অনেক বিকল্প ধ’রে) চিন্তা ক’রে রূপ নয়- প্রেম নয়- জ্ঞানের বল্মীকে
পৃথিবীরে জাগায়েছে;- কোথাও নাই ক’ কিছু শিথিল আভার প্রয়োজন

মানুষ যে শারীরিক নয় তাহা পৃথিবীর নতুন মানব
বুঝিয়াছে;- উপনিষদেরা শ্বেত পীত হয়ে অতীতের মানবহিয়াকে
নিঃশেষে পারে নি দিতে যেই স্বাদ- ট্যারা চোখ- খোঁড়া ঠ্যাং- শবের পাহাড়ে আরও শব
জগতের সেই অসারতা, প্রিয়, শিখাতেছে তোমাকে- আমাকে
কোনও দিন পৃথিবীতে মানুষের দু’-দিনের নির্দিষ্ট জীবন
এত নিরুদ্দেশ ছিল?- সৌন্দর্যের হাত ছেড়ে কোনও হিম শূন্যের ফাঁকে
ঝুলেছিল এ-রকম?- মাছির ভিড়ের মতো জেনেছিল এমন সহজ নিঃসরণ?
স্টিলের চালুনি বেয়ে ঝরেছিল এ-রকম নর্দামার বমির মতন?

আমি দৃঢ়তর তবু;- এই সব সেঁকো-বিষ-বিজ্ঞানে দেব না ক’ ধরা
হে হৃদয়,– এই সব অগ্রসর তোমার রক্তের তরে নয়
যাহারা প্যাগোডা ভাঙে, পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফেলে- অতীতের চিন্তা আর রূপের পসরা
কাচের বাজারে যারা ছুঁড়ে ফেলে- মশালের তীব্র কেরোসিন-গন্ধময়
দণ্ড লয়ে হৈ-হৈ করে রক্তে সারা-রাত- মনীষার শান্তি অবসর
কোনও দিন ছিল না ক’ যাহাদের জীবনের বীজে;- জননীরে খুন ক’রে পাটকিলে জয়
যাহাদের লোমে জ্বলে সারা-রাত- আজও যারা দাঁত শুধু, যাহারা নখর

সময়ের বিঘূর্ণনে আজ এই কবলিত পৃথিবীতে- তাহাদের ভিড়ে
হয়তো-বা আমাকেও সৈনিক সাজিতে হবে পথ থেকে পথে
তবু আমি বলিব না- হারায়ে গিয়েছি আমি ট্যাঙ্ক আর গ্যাসের তিমিরে
প্রেম নাই- স্বপ্ন নাই- রূপ নাই- শবের আমিষ-ভরা হায়নার দারুণ জগতে
মাটির ঘড়ার মতো তোমারে কি বানায়েছে পৃথিবীর কোনও কুম্ভকার
হে হৃদয়,- তুমি পাখি কোনও দূর নক্ষত্রের দীর্ঘ থাম হতে
অনেক নীচের জলে প’ড়ে গেছ- তবু রং গান আছে, প্রেম আছে গাঢ় পাখনার!