কথোপকথন ৫

শুভঙ্কর
কাল তুমি চলে গেলে উত্তরের হাওয়ার ভিতরে
বৃষ্টির মর্মর ছিঁড়ে। তোমার ছায়াই রইল পড়ে
আমার একান্ত কাছে, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,
তুমি যার সর্বাঙ্গীন ছায়া তাকে কি রকম চেনো?
চেনো কি আঁশের মতো, রোমকূপের মতো করে চেনো?
যদি চেনো বলো তার কুশল সংবাদ, গুপ্তকথা।
পায়ের ঘুঙুর থেকে মাথার খোঁপার কাঁটা ফিতে,
কটা সেফটিপিন থাকে কোনখানে কিংবা ব্রেসিয়ারে
কটা হুক, সে কি তার নিজের চন্দন নিজে বাটে?
যখন শাওয়ারে ভেজে, তুমি কি পাথর হয়ে যাও?
সমস্ত শোনাও, আমি বকশিশে বকশিশে ভরে দেব।
মাই গড, সে তো দেখি তোমার চেয়েও লজ্জাতুর।

নন্দিনী
বিবাহিতা রমনীর কত যে ঝঞ্ঝাট থাকে তা তুমি জানো না।
কাল এত ব্যস্ততায় বৃষ্টির ভিতরে দৌড়ে আসতে হয়েছিল
আমার ছায়া যে কোথা রয়ে গেল মনেই পড়ে নি।
তুমি তো আমার পরে উঠেছ, দেখেছ কোনখানে?
শেষ চুম্বনের জন্যে যখন টানলে, বুকে লেপা,
তখনও দেখেছি আছে পিঠের আঁচলে ঘাড় ঘেঁসে।

অন্য কারো হাতে পড়লে সর্বনাশাকাণ্ড হয়ে যাবে।
সমগ্র সংসার ঝামরে পড়বে প্রশ্নে, যখন ফিরিস
তোর ছায়া তোর সঙ্গে থাকে না আজকাল প্রায়ই দেখি।
ছায়ার নৈবেদ্য দিয়ে কার পুজো করিস গোপনে?

শুভঙ্কর, প্লীজ, যদি খুঁজে পাও যত্নে রেখে দিও।

শুভঙ্কর
আছে, খুবই যত্ন করে তোমার ছায়াটি রাখা আছে
বইয়ের ভিতরে বুক-মার্কের মতন নিরাপদে।

যে পাখি আকাশে ওড়ে সূর্যের বেদীর চারপাশে
তার আলো আকাশকে ভিন্ন আলোকণিকা জোগায়,
শুধু তার ছায়াকেই মানুষ খাঁচায় পুষে রাখে।

তোমার সজীব মূর্তি সংসারের ভূমিখণ্ড জুড়ে
লণ্ঠনের আলো হয়ে ঘুরুক গার্হস্থ হাতে হাতে।
কেবল আমার খাঁচা ছায়াটুকু পেয়ে খুশি হোক।

নন্দিনী
কবিতার ভাষা জানা আছে বলে ভেবেছ তা দিয়ে
দিনকে বানাবে রাত, রাতকে দিনের অট্টহাসি?
কি পাওনি যে এত শোক? সত্যির শরীরে মিথ্যের
ছেঁড়া জামা ময়লা ধুতি পরিয়ে প্রভূত সুখ বুঝি?
বশিষ্ঠের ক্ষুধা নিয়ে সমুদ্রকে শোষণ করেছ
যখন ছিলাম আমি পঞ্চদশী, পূর্ণিমার পাড়ে,
সেই আদিকাল থেকে গতকাল বিকেল অবধি।
ধূর্ততম বেড়ালের হাসিকে ভাসিয়ে সারা মুখে
মাংস আঁশ শেষ করে এখন মাছের হাড় কাঁটা
কি করে চিবোবে তার ফন্দী আঁটছ। আমি স্বর্গে গেলে
কে জোগাবে অন্নজল অনাহারী থালায় গেলাসে?

শুভঙ্কর
স্বর্গে যাবে? চলে যাও। স্বর্গে গিয়ে বিয়াত্রিচে হও।
ভার্জিল ছাড়াই আমি পৌঁছে যাব সর্বোচ্চ চূড়ায়।
তোমার ছায়াকে অগ্নিদ্যূতি দিয়ে জীবন্ত সাজাব।