সরস্বতী

তুষারে যে সর পড়েছে মানস-সরের ফটিক জলে
কে ফোটালে শ্বেত শতদল সহসা সেই তুষার-তলে!
কে জেগেছ আদিম উষা
কে জেগেছ জ্যোতির্ভূষা
শুভ্র আলোর মৃণাল-সূতায় বিশ্ব-হিয়ার কৌতূহলে
কে রেখেছ অমল চরণ গোপন প্রাণের পদ্মদলে!

মুকুট তোমার উজল রাজে শিশু-আঁখির শশী-কলায়,
মুক্ত মনের লাবণ্যেরি মুক্তামালা তোমার গলায়;
সত্য স্বপন দ্বন্দ্বহারা
জড়ায় পায়ে নূপুর পারা
ঘুরে ফিরে ছন্দ-মরাল ভিড়ায় ডান পায়ের
তলায় তিমির গলায় কাঁকন তোমার—তৈরী সে যে থির-চপলায়।

চাঁদের আভা নিছিয়ে নেওয়া তোমার বীণার চাঁদির তারে
চকোর-লোভন উথলেছে সুর তিতিয়ে ভুবন সুধার ধারে;
ধবল-গিরির পৈঠা পরে
মর্ম্মরে আর স্ফটিক স্তরে
বরফ-চুরের বিম্বে শাদা ঝর্ণা ঝরে হীরার হারে
শুভ্র সুরের গান জেগেছে—প্রাণ জেগেছে সে ঝঙ্কারে।

চতুর্ম্মুখের হাস্য-রুচি যশঃ-শুচি জ্যোতির্ম্ময়ী।
দেবি! তোমার দিব্য আঁখির দীপ্তি-পাতে উজল ত্রয়ী।
জ্যোৎস্না-জরির সূতায় বোনা
কুন্দ-কলির চন্দ্র-কোণা—
বসন তোমার ভাব-তনুটি বেড় দিয়ে ওই স্পর্শে মহী
সত্য-সূৰ্য্য নেত্ৰ তোমার তুমি স্বয়ম্প্রভা অয়ি!

তুমি সকল প্রকাশ করা সকল-শুদ্র মূর্ত্তি তব,
নিখিল-চিত্ত-নবীন-করা প্রণব তুমি- জীবন নব;
সত্য তুমি নিত্য তুমি
লক্ষ্মীছাড়ার বিত্ত তুমি
যে বর হাতে নাই বরদার দাও যে তুমি সে দুর্লভও
মর্ত্ত্য-লোকের অমরতা—তোমার কৃপা-সমুদ্ভব।

পুণ্য-শুভ্র অধর তোমার স্মিত-হাসির পুলক তা’তে,
প্রজ্ঞা তোমার চোখের কাজল সৃজন-প্রাতে প্রলয়-রাতে;
নীহারিকার নিতল বুকে
শীতল চরণ রাখলে সুখে
ভায় ছায়াপথ শূন্যে—তোমার শুভ্র পায়ের আল্পনাতে;
চন্দনে শ্বেত পরশ তোমার হরষ্ চন্দ্র-মল্লিকাতে।

মন্-গহনের শ্বেত হরিণী! মহাশ্বেতা সরস্বতী!
মন্-মানসের ফুল্ল-কমল অমল তোমার ওই মূরতি।
অমল তোমার অভ্র-পুঁথি
ধবল শঙ্খ তোমার স্তুতি
অমল তপের লও আহুতি চিত্তলোকের ঊষা-জ্যোতি
কপূরেরি শুভ্র প্রদীপ তারায় তোমার সন্ধ্যারতি।

আশিস তোমার মৃত্যুজয়ী, হাসি সে শুকতারার ভায়ে;
মন্দারেরি অমল মালা বিলাও দেবী! ডাহিন বাঁয়ে।
মরাল রথে মনোজবে
ফিরছ তুমি ভাবের ভবে
গন্ধরাজ আর পারিজাতের অঞ্জলি ওই শুভ্র পায়ে,—
পায়ের আভায় ঘাম দিয়েছে চন্দ্রকান্তমণির গায়ে!

সদ্য-গলা বরফে ফুল ফুটিয়ে হঠাৎ লাখে লাখে
চেতন-লোকের মগ্ন-তটে জাগে তোমার প্রসাদ জাগে,
দ্বাদশ রাশির আলোর ঝামর
চাঁচর মেঘে ঢুলায় চামর,
লুটায় কবি, সিদ্ধ অমর তোমার পদ্মাসনের আগে,
উজল তোমার কিরীট-হীরা ধ্রুবতারার কিরণ-রাগে॥