ষাঁড়-গাধা-ছাগলের কথা

একটি লোকের একটা ষাঁড়, গাধা আর একটা ছাগল ছিল। লোকটি বেজায় অত্যাচার করত তাদের ওপর। ষাঁড়কে দিয়ে ঘানি টানাত, গাধা দিয়ে মাল বওয়াত আর ছাগলের দুধ দু্য়ে নিয়ে বাচ্চাদের কেটে কেটে খেত, তাদের কিছুই প্রায় খেতে দিত না। কথায় কথায় বেদম প্রহার দিত।

তিনজনেই সব সময় বাঁধা থাকত, কেবল রাত্তির বেলায় ছাগল-ছানাদের শেয়ালে নিয়ে যাবে ব’লে গোয়ালঘরের মাচায় ছাগলকে না বেঁধেই ছানাদের সঙ্গে রাখা হত।

একদিন দিনের বেলায় কি ক’রে যেন ষাঁড়, গাধা, ছাগল তিনজনেই ছাড়া অবস্থায় ছিল। লোকটিও কি কাজে বাইরে গিয়ে ফিরতে দেরি ক’রে ফেলল। তিনজনের অনেক দিনের খিদে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই গাধা সোজা রান্নাঘরে গিয়ে ভাল ভাল জিনিস খেতে আরম্ভ করল। ষাঁড়টা কিছুক্ষণের মধ্যেই সাফ করে ফেলল লোকটির চমৎকার তরকারির বাগানটা। ছাগলটা আর কি করে, কিছুই যখন খাবার নেই, তখন সে বারান্দায় মেলা একটা আস্ত কাপড় খেয়ে ফেলল মনের আনন্দে।

লোকটি ফিরে এসে কাণ্ড দেখে তাজ্জব ব’নে গেল। তারপর চেলাকাঠ দিয়ে এমন মার মারল তিনজনকে যে আশেপাশের পাঁচটা গ্রাম জেনে গেল লোকটির বাড়িতে কিছু হয়েছে। সেদিনকার মত তিনজনেরই খাওয়া বন্ধ করে দিল লোকটি।

রাত হতেই মাচা থেকে টুক ক’রে লাফিয়ে পড়ল ছাগল। তারপর গাধা আর ষাঁড়কে জিজ্ঞেস করল: গাধা ভাই, ষাঁড় ভাই, জেগে আছ?

দুজনেই বলল: —হ্যাঁ, ভাই!

ছাগল বলল: —কী করা যায়?

ওরা বলল: কী আর করব, গলা যে বাঁধা!

ছাগল বলল: সেজন্য ভাবনা নেই, আমি কি-না খাই?

আমি এখুনি তোমাদের দড়ি দু’টো খেয়ে ফেলছি। আর খিদেও যা পেয়েছে!

ছাগল দড়ি দুটো খেয়ে ফেলতেই তিনজনের পরামর্শ-সভা শুরু হয়ে গেল।

তারা পরামর্শ করে একটা ‘সমিতি’ তৈরী করল। ঠিক হল আবার যদি এইরকম হয়, তাহলে তিনজনেই একসঙ্গে লোকটিকে আক্রমণ করবে। ষাঁড় আর গাধা দু’জনে একমত হয়ে ছাগলকে সমিতির সম্পাদক করল। কিন্তু গোল বাঁধল সভাপতি হওয়া নিয়ে। গাধা আর ষাঁড় দু’জনেই সভাপতি হতে চায়। বেজায় ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। শেষকালে তারা কে বেশী যোগ্য ঠিক করবার জন্যে, সালিসী মানতে মোড়লের বাড়ি গেল। ছাগলকে রেখে গেল লোকটির ওপর নজর রাখতে। মোড়ল ছিল লোকটির বন্ধু। গাধাটার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙতেই বাইরে বেরিয়ে মোড়ল চিনল এই দুটি তার বন্ধুর ষাঁড় আর গাধা। সে সব কথা শুনে বলল: বেশ, তোমরা এখন আমার বাইরের ঘরে যাও, আর বিশ্রাম করো, পরে তোমাদের বলছি কে যোগ্য বেশী। ব’লে সে তার গোয়ালঘরে দেখিয়ে দিল। দু’জনেরই খুব খিদে। তারা গোয়ালঘরে ঢুকতে মোড়ল গোয়ালের শিকল তুলে দিয়ে বলল: মানুষের বিরুদ্ধে সমিতি গড়ার মজাটা কি, কাল সকালে তোমাদের মনিবের হাতে টের পাবে।

এদিকে অনেক রাত হয়ে যেতেই ছাগল বুঝল ওরা বিপদে পড়েছে, তাই আসতে দেরি হচ্ছে। সে তার ছানাদের নিয়ে প্রাণের ভয়ে ধীরে ধীরে লোকটির বাড়ি ছেড়ে চলে গেল বনের দিকে।

সকাল হতেই খোঁজ পড়ে গেল চারিদিকে। লোকটি এক সময় খবর পেল ষাঁড় আর গাধা আছে তার মোড়ল বন্ধুর বাড়ি। অমনি দড়ি আর লাঠি নিয়ে ছুটল সে মোড়লের কাছে, জানোয়ার আনতে।

‘মানুষকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই’ এই কথা ভাবতে ভাবতে খালি পেটে ষাঁড় আর গাধা পালাবার মতলব আঁটছিল। এমন সময় সেখানে লোকটি হাজির হল। তারপর লোকটি হাতে প্রচণ্ড মার খেতে খেতে ফিরে এসে গাধা আর ষাঁড় আবার মাল বইতে আর ঘানি টানতে শুরু করল আগের মতই। কেবল ছাগলটাই আর ফিরে এল না। কারণ অনেক মহাপুরুষের মত ছাগলটারও একটু দাড়ি ছিল।

উপদেশ: নিজের কাজের মীমাংসা করতে অন্যের কাছে কখনো যেতে নেই।