আমলাতন্ত্র কি এক ধরনের পশুতন্ত্র?

আমলা শব্দটি এখন আর ভালাে শােনায় না, একটা খারাপ গালি ব’লে মনে হয়। শব্দটির অর্থের পতন ঘটেছে, নিন্দাসূচক হয়ে উঠেছে শব্দটি। শব্দের নিজের কোনাে দোষ নেই, গুণও নেই; যার সাথে জড়িত থাকে শব্দ, তারই সংস্পর্শে শব্দ দূষিত হয়, প্রশংসাসূচকও হয়। একটি অশোভন ব্যাপারের সাখে জড়িত থাকার ফলে ইংরেজি প্রিভি, ল্যাট্রিন, টয়লেট, বাথরুম, ডব্লিউসি প্রভৃতি শব্দ দূষিত হয়েছে; বার বার শব্দ বদলিয়েও ব্যাপারটিকে শােভন করা যায় নি। ওই শব্দগুলাের কোনাে অপরাধ ছিলাে না। আমলা শব্দটিও নির্দোষ, নিপরাধ; তবে যাদের সাথে এটি জড়িত কয়েক শতক ধ’রে, তাদের দূষিত প্রতিভাই শব্দটিকে দূষিত করেছে। আমলারা একটি স্বার্থপরায়ণ সুবিধাভােগী শ্রেণী; যদিও তাদের জন্ম দেয়া হয়েছিলাে জনগণের সেবার জন্যে, কিন্তু সেবার বললে শক্তিকেন্দ্রে ব’সে তারা শােষণপাড়ন করেছে জনগণাকে। তবে তারাও সেবা করে, তারা সেবা করে শক্তিমানদের; যারাই ক্ষমতা দখল করে আমলারা হয়ে ওঠে তাদেরই একান্ত বিনীত সেবক। আমলারা বিবেকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে স্বার্থে ও শক্তিতে। নানা শক্তিকেন্দ্রে থাকার ফলে তারা উপভােগ করে বিপুল ক্ষমতা। যে-ক্ষমতা তাদের দেয়া হয়, তা তাে তারা উপভােগ করেই, এমনকি যে-ক্ষমতা তাদের দেয়া হয় না, তাও সম্ভোগ করে তারা। ক্ষমতার অপব্যবহারই শক্তি, সদ্ব্যবহার কোনাে শক্তি নয়। আমাদের আমলারা ক্ষমতা অপব্যবহারেই দক্ষ। সব ক্ষেত্রে তারা অহমিকাপরায়ণ, উদ্ধত, কিন্তু শক্তিমানদের কাছে তারা বিনীত ভৃত্যের মতাে; এবং তারা দুর্নীতিপরায়ণ, পীড়নবাদী, তারা বিলাস ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ। এমন কোনাে দোষ নেই, যাতে তারা অলঙ্কৃত নয়। শ্রেণীচরিত্রে তারা সবাই এক, যদিও দু-একটি খাপ-না-খাওয়া আমলা থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমলারা শক্তিমান, তাই জনগণ তাদের সমীহ করে; কিন্তু শ্রদ্ধা করে না। সম্প্রতি একটি দৈনিকে এক আমলা নিজের শ্রেণীর মহিমা গান করতে গিয়ে নিজেকে ও নিজের শ্রেণীকে আরাে ডোবানোর উপক্রম করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর অহমিকায় জনগণ মুগ্ধ হয়ে ধন্যধন্য করবে, কিন্তু তাঁকে হতাশ করে চারদিক থেকে রিরি ধ্বনি উঠতে থাকে। ওই আমলাটি সম্ভবত একটু সরল, তাই পরিচয় দিয়েছেন নির্বুদ্ধিতার। মাখনেরুটিতে তিনি বেশ আছেন, এ নিয়েই তাঁর সন্তুষ্ট থাকা উচিত ছিলাে, মহিমা দাবি করতে গিয়েই তিনি ডুবিয়েছেন নিজেকেও নিজের মহান শ্রেণীটিকে। আমলাতন্ত্রকে ঘােড়ার রূপকে দেখতে গিয়েই তিনি পড়েছেন প্রথম বিপদে । তিনি হয়তাে বুঝতে পারেন নি যে বাঙলাদেশে আর কোনাে কিছু রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, সব কিছুই প্রকাশ করে আক্ষরিক অর্থ। ঘােড়ী যতােই তেজি হােক-না-কেনাে, তা একটি জন্তু, অর্থাৎ পশু; আর পশু হচ্ছে পশু। তাই আক্ষরিকার্থে আমলাতন্ত্র হয়ে উঠেছে, পশুতন্ত্র, যা স্বীকার করে নিতে জনগণের কোনাে দ্বিধা তাে নেইই, বরং জনগণ এ-ধারাটিকেই যথার্থ ব’লে মনে করে। জনগণ এতাে দিন যাদের পশু বলে ভেবে আসছিলাে যাদের পায়ের নিচে থেঁতলে যাচ্ছিলাে, অথচ স্পষ্টভাবে বলতে পারছিলাে না যে তারা একটি বিরাট পশুতন্ত্র দ্বারা পীড়িত, তারা হঠাৎ আমলার মুখে আত্মকথা শুনে খুব সুখী বােধ করছে। ওই আমলা নিজের শ্রেষ্ঠতা বােঝানাের জন্যে অনেক কিছু দাবি করেছেন, যা শিশুসুলভ ও হাস্যকর; এবং কোনাে কোনাে অংশে অশ্লীল। তিনি দাবি করেছেন আমলারা মেধাবী, তারা প্রথম শ্রেণী পাওয়া। কিন্তু এ প্রথম শ্রেণী কোনাে কাজে লাগে নি, তা সেবা করছে তৃতীয় শ্রেণীর। ওই আমলা যাদের স্যার স্যার করে, ওই মন্ত্রীরা তাে তৃতীয় শ্রেণীরও নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলাে প্রথম শ্রেণীর ছাত্র তৈরি করেছে তৃতীয় শ্রেণীকে স্যার স্যার করার জন্যে। এতে বােধহয় আমলারা গৌরব বােধ করে। আমলাদের রূপসী স্ত্রী লাভের কথাও তিনি গর্বের সঙ্গে বলেছেন শুধু এটুকু বলেন নি ওই রূপসী স্ত্রীরা আমলাদের চোখে বেশি দিন রূপসী থাকে না, আর পৃথিবীতে নতুন রূপসীরাও দেখা দেয়, অধস্তনদের রূপসী স্ত্রী থাকে এবং আমলারা নতুন রূপে বার বার মুগ্ধ হয়। আমলাদের পারস্পরিক স্ত্রী বদল তাে খুবই পরিচিত ঘটনা। এই তাদের প্রধান সাংস্কৃতি।

বাঙলাদেশের আমলাতন্ত্রে সম্ভবত জড়াে হয়েছে পৃথিবীর সেরা ঘােড়াগুলাে; এমন পেশল ও প্রতিভাবান ঘােড়া আর পাওয়া যাবেনা কোথাও। তাদের প্রতিভার কোনাে শেষ নেই। ক্ষমতার অপব্যবহারে তারা দুস্যু, দুর্নীতিতে অদ্বিতীয়, নারী সৌন্দর্যের তারা প্রবল উপাসক, এমনকি শিল্পসাহিত্যের এলাকায়ও তারা অপ্রতিহত। সবক্ষেত্রেই তারা বিশ্বাসী উপরি আয়ে। তারা শুধু অর্সম্পদ অবৈধভাবে উপার্জন ক’রেই পরিতৃপ্ত থাকে না, তারা মানসম্মানকেও তাদের উপরি আয় বলে গণ্য করে থাকে। পার্থিব অপার্থিব সব কিছু অর্জনেই চোখে পড়ে জেলা প্রশাসকই সবকিছু সেখানে; সে এখানে সভাপতি, ওখানে প্রধান অতিথি, এখানে ফুলের মালা নিচ্ছে, ওখানে নিচ্ছে ফুলের তােড়া। এসব তারা পায় ক্ষমতা ব্যবহার ক’রে; তাদের প্রধান অতিথি না করা হলে জেলার কোনাে সংস্থা কোনাে সরকারি সাহায্য পায় না। শুনেছি আমলা লেখকরাও পত্রপত্রিকা ও প্রকাশকের ওপর চাপ সৃষ্টি, লেখা ছাপানাের জন্যে নিজের (অর্থাৎ জনগণের) সংস্থা থেকে ঋণ দেয় পত্রিকার মালিককে। বাঙলাদেশের অনেক আমলা তিন অক্ষরের সিএসপি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে নি, পিএইচডিও হয়ে উঠেছে। আমলাদের পিএইচডি ডিগ্রির কোনাে দরকার নেই, তবু অনেকে সেটা নিয়েছে, আর যেভাবে নিয়েছে তাও খুব পরিচ্ছন্ন নয়। যে-বৃত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকেরা পেতে পারতাে, তা বিশেষ কৌশলে বাগিয়ে নিয়েছে তারা। এতে তাদের সুবিধা হয়েছে, কিন্তু দেশের ক্ষতি হয়েছে। আমলাদের অবৈধ আয়ের কোনাে সীমা নেই। মহকুমা ও উপজেলা থেকে শুরু করে তারা যে কতােভাবে অবৈধ উপায় ক’রে তা ভালােভাবে জানে শুধু আমলারা। বাঙলাদেশ তিনটি তন্ত্রের শিকার, এগুলাে হচ্ছে রাজনীতিকত, আমলাতন্ত্র ও সেনাতন্ত্র; তবে এদের মধ্যে আমলাতন্ত্রই সুবিধাসম্ভোগ করে বেশি সুবিধাভের জন্যে রাজনীতিকদের দুশ্চরিত্র হতে হয়, তারা পুরােপুরি নিন্দিত। তবে তারা সবাই সব সময় সুযােগ পায় না; বিশেষকালে বিশেষ দালালেরা সুবিধা লাভ করে। সেনাতন্ত্র যখন নিজের এলাকা পেরিয়ে ক্ষমতা দখল করে, তখন সুযোগসুবিধায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু আমলাতন্ত্র সুবিধা ভােগ করে সব সময়; পাকিস্তানপর্বে তারা সুবিধা ভোগ করেছে বিনীত পাকিস্তানি আমলারূপে, স্বাধীনতার পর তারাই লাভ করেছে সবচেয়ে বেশি সুবিধা, উপসচিব একলাফে সচিব হয়ে গেছে। আবার সামরিকতন্ত্রের কালে তারা পাচ্ছে সর্বাধিক সুবিধা; এখন তারা নিয়মিত মন্ত্রী হচ্ছে, আমলা থাকতে আর ভালাে লাগছে না। অবসরপ্রাপ্ত আমলারাও এমন ব্যবস্থা করে নেয়, যাতে বিনাশ্রমে মাসে লাখ টাকা ঘরে আসে। এ-আমলাতন্ত্রকে যদি ঘােড়তন্ত্র অর্থাৎ পশুতন্ত্র বলা হয়, তাহলে নিন্দা করা হয় না। দেশ চালানাের জন্যে আমলা দরকার, তবে আমলাতন্ত্র দরকার নয়, বরং তা ক্ষতিকর। আমাদের দেশে জনগণ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরাধীন নাগরিকের মতাে বাস করে; তারা যেখানেই যায় দেখে প্রভুর ভঙ্গিতে বসে আছে বিভিন্ন আমলা। প্রত্যেকে তার ওপরে অর্পিত দায়িত্বকে ব্যবহার করে ক্ষমতা হিসেবে। আমাদের আমলাতন্ত্র যে পশুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, তার কারণ যারা রাষ্ট্র আধিকার করে আছে কয়েক শতাব্দী ধরে, তারা জনগণের প্রতিনিধি নয়। এককালে তারা ছিলাে ব্রিটিশ, পরে পাকিস্তানি, এবং স্বাধীনতার পর দেশ অধিকার করেছে গণশত্রু সুবিধাভােগীরা। প্রতিটি পর্বে আমলাতন্ত্র পশু থেকে আরাে পশু হয়ে উঠেছে, বিকাশ ঘটিয়েছে পশুতন্ত্রের। এদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সবচেয়ে কম যা দরকার, তা হচ্ছে দেশকে আমূল বদলে দেয়া। বাঙলাদেশ এখন যেমন আছে তেমনই থাকবে আর আমলাতন্ত্র হয়ে উঠবে দেবদূততন্ত্র এটা আশা করা অন্যায়।