নিরুপায়

শ্রমিকের ফাটছে পিলে ধনিকের বুটের ঘায়ে,
বণিকের বংশ বাড়ে তেতলা প্রাসাদ-ছায়ে;
কে খাটে, কেই বা খাটায়। কে বা কাল খেলায় কাটায়!
যে বােনে গায়ের কাপড়, সে মরে আদুল গায়ে!

বাহবা বিধির বিধান, বাজা ভাই বাজনা বাজা,
ঢেকে দে ভাবনা যত—দুনিয়ার এমনি রাজা!
চোরেরা বাড়ছে খাসা, সাধুরা কোণায় ঠাসা,
রেখে দে ধর্মকথা, নিয়ে আয় কাঁকড়া-ভাজা!

ওরে ভাই—বড্ড ক্ষিদে, কী করি বল তাে উপায়,
লাগা না ফন্দি-ফিকির, যা করে মিলবে দু পাই!
পশুরাও খাচ্ছে চরে, মানুষ ক্ষিদেয় মরে—
ধনীদের ঘর ভরে যায় গরিবের শ্রমের রূপায়!

কত আর সহ্য হবে, বেটারা মােটর চড়ে;
দু বেলা পোলাও খেয়ে বসে বেশ আরাম করে!
দেখা হয় পথের ধারে— গুমরে চিনতে নারে,
দু টাকা চাইতে গেলেই মাথাতে টনক নড়ে।

চুরিটা মন্দ কিসে—সমাজের ফকিকারি,
গরিবে রাখতে চেপে বড়দের খবরদারি!
এদিকে পেট জ্বলে যায়, কী হবে পুঁথির কথায়?
পরকাল পচুক চুলায়—বাচাটাই কেলেঙ্কারি!

যদি বা ধরাই পড়ি, তাতে আর ভয় কী আছে?
—ছেলেটা ধুকছে জ্বরে, রেখে যাই কার কাছে!
সে মাগী গর্ভে ধরে বেঁচেছে পূর্বে মরে,
একা তাই ভাবছি বসে, কী করে দুদিক বাঁচে!

জমিটার খাজনা দেবার এসেছে জোর তাগাদা,
মােটে যে হয়নি ফসল, জমিদার বুঝবে না তা!
ভিটে মাের সাত-পুরুষে তবু নেয় পয়সা ঠুসে—
কোথাকার কেমন বিধান, বুঝি না তাও তাে দাদা!

মাটি তাে সঙ্গে করে আনেনি ধনীর ছেলে,
সে বেটা জন্মে শুধু কী করে দখল পেলে?
চিরদিন লাঙল ধরে এসেছি আবাদ করে—
তার আবার পাওনা কিসে, দিব যে চাইতে এলে!

মাটি তাে মাটিই বেটি, মুখে তার রা না কাড়ে,
নইলে ছিলাম দুলে কারুকে এমনি ছাড়ে!
থাক তাের আইন কানুন, ঘরে যার জুটছে না নুন,
সে দেবে পয়সা গুনে,—কে বা তা চাইতে পারে!

পেটে যে পায় না খেতে, সে দেবে দেনার কড়ি—
কাকে—যে সােনার খাটে শুয়ে ভয় পেট-টা ভরি।
অথচ কুপিয়ে মাটি না খেয়ে মােরাই খাটি—
টাকা তাে তৈরি মােদের, তারা পায় কেমন করি?

সাধে কি রাগছি রে ভাই—ছেলেটা কদিন ধরে
বাদলে আমন রুয়ে পড়েছে এমনি জুরে!
দেখাব বদ্দি যে ভাই, তারো যে পয়সাটি নাই,
খাওয়াব মিছরি সাবু—তাই বা পাই কী করে।

যাক্‌গে—মােড়ল দাদা, ঠিলি কি খালিই নাকি!
দ্যাখাে না উপুড় করে—দু ফোঁটা নাই কি বাকি?
ভেবাে না ছিদাম দুলে নেশাতে পড়বে ঢুলে,—
নসিবে ঘটবে না তা—তাতে যে ভালােই থাকি।

মাগীটা ভালােই গেছে-কী বলাে বলাই কাকা?
দুনিয়ায় মরাই ভালাে, নাই যার পয়সা টাকা!
—ছলেটা ধুঁকছে জ্বরে দ্যাখাে না মরছি ডরে,
সে মাগী ভাগ্যবতী, পড়েছে চিতায় ঢাকা!

ভগবান! থাকিস যদি, একবার আয় তাে কাছে,
আমি যে মুখ্যু মানুষ—শুনি কি বলার আছে!
কতদিন লুকিয়ে রবি? দুনিয়ায় পয়সা সবই—
কথাটা বল্‌ তাে মুখে—বুঝে নিই কতক আঁচে!

মানুষের সাচ্চা-ঝুটার যদি না কদর থাকে,
দেহে যার শক্তি আছে, বুঝানোর কাজ কি তাকে?
অবিচার ভণ্ডামিতে, কেই নাই দণ্ড দিতে—
যদি হয় এমন ধারা,—কে ফাঁকে ছাড়বে কাকে?

কী বলিস মােড়ল দাদা, ভয়ে কি ভড়কে গেলি?
মনে হয়, মাটির মতন দুনিয়ায় পালটে ফেলি।
উঁচ সব ঢেলায় ধরে চষে দিই সমান করে,
পয়সার কোথায় বাসা, দেখি তাই কোদাল ঠেলে।

—রাত, ভাই অনেক হলাে, ছোঁড়াটা করছে বা কি!
ভালাে না লাগছে কিছুই, না-লাগার কসুরটা কী?
সাবু আর মিছরি কেনা—যদি বা তা হবে না,
তবে এই দুঃখ সয়ে কেন-বা বেঁচেই থাকি?