অঞ্জলি

এই নে আমার অঞ্জলি গো এই নে আমার অঞ্জলি,
মানস-মরাল জাগ্‌ল আবার উঠল অগাধ হিল্লোলি!
এই নে অশোক এই নে বকুল
এই নে গে ফুল এই নে মুকুল
মুক্তালতার বন যে হ’ল মনের বনের সব গলি।

গানের তানের বান এসেছে, হৃদয় কুজে, কোকিল কয়!
ফাল্গুনের এই প্রাণের ধারা ছন্দ-হারা ফন্তু নয়;
চন্দনে শ্বাস ফেল্ছে ফণী
হাওয়ায় ওঠে কলধ্বনি
হিয়ায় সূর্যকান্ত-মণি হঠাৎ হ’ল হিরন্ময়!

হাল্‌কা হাসির গুল্-গুলাবি পাপ্ড়ি কেবল ছড়িয়ে রে
আমেজে মশগুল ক’রে দ্যায় সকল শিকল নড়িয়ে যে!
উড়োপাখীর পাখার পরশ
লাগ্‌ল হঠাৎ জাগ্‌ল হরষ,
হৃদয়-তরুর শাখায় শাখায় আলোক-লতা জড়িয়েছে।

এই নে আমার অঞ্জলি গো এই নে আমার অঞ্জলি,
হিয়ায় সূৰ্য্যমল্লিকা মোর উঠেছে আজ ঝল্মলি!
এই নে অত্র আবীর রাশি
এই নে অশ্রু এই নে হাসি
এই নে আমার প্রাণের অর্ঘ্য পারিস্ তো যা’ পায় দলি।

বসন্তের এই মৌলি-মণি আমের মউল-পুঞ্জ নে
মৌন আমার মুখর হ’ল মৌমাছিদের গুঞ্জনে!
এই নে আমার আশার স্বপন
এই নে ব্যক্ত এই নে গোপন
এই নে আসল এই নে ফসল এই ফসলের উঞ্ছ নে।

কুন্দফুলের শেষটি নে গো যবের প্রথম শীষটি নে,
সৃষ্টিছাড়ার সৃষ্টি নে এই নে মোর অনাসৃষ্টি নে;
যা’ আছে মোর সম্ভাবনায়
যা’ আছে মোর ভয়-ভাবনায়
যা’ আছে মোর চিত্ত-কোণায়—তিক্ত কটু মিষ্টি নে!

এই নে প্রীতি তরুণ রীতি এই নে আমার চাপল্য,—
যৌবনের এই প্রবাল-রাঙা দুকূল-ভাঙ্গা প্রাবল্য;
এই নে আমার তৃপ্তি শান্তি
এই নে আমার দীপ্তি কান্তি
এই জীবনের এই ভুবনের এই নে বিফল সাফল্য।

এই নে সাধন আর আরাধন মোহের কাঁদন গ্রহের ফের,
এই নে গো মোর পুণ্য পাপের তপের তাপের যুগের জের,
এই নে ইষ্ট এই নে রিষ্টি
এই নে ক্লান্ত চোখের দৃষ্টি
এই নে লক্ষ্মী-বিক্রী-করা পুজির থলি দরিদ্রের।

দুপুরবেলার বৈকালী হায় এই নে আমার আঁখির লোর,
সাঁঝ না হ’তেই সন্ধ্যামণি ফুট্ল এবার কুঞ্জে মোর;
পলাশ যখন লাল আলোকে
জম্ছে তিমির আমার চোখে
শাঙন অভ্র নাম্ছে—যখন কুঞ্জে আবীর রঙের ঘোর।

ঝাপ্সা-চোখের-শোকের-অশোক! হিয়ার-মণি-দীপ-শিখা!
তোমার স্মিত হাসির বিভা সে মোর যজ্ঞ-শেষ-টীকা;
ওই হাসিটির মত্ত লোভে
ভুলে আছি সকল ক্ষোভে
স্বপ্নে ফোটাই সূর্যমুখী উজল সূৰ্য্যমল্লিকা।

অনেক তোমার ভক্ত আছে অনেক হোর বাল্মীকি
হোম্রা চোম্রা নই আমি, তুই মোর পানে হায় চাইবি কি?
আমার হেলাফুলের মালায়
ঠেলবি কি হায় ফেল্বি হেলায়?
দয়ার দাবী নাই যে জনার কি হবে তার বল্ দেখি!

ভাবের কুবের ভাণ্ডারী হায়, নয় এজনা এক্বারেই,
চিত্ত-সাগর মথন-করা চিন্তা-মণি-মুক্তো নেই;
অকূলেরি কূল আঁকড়ি’
কুড়াই ঝিনুক, শামুক, কড়ি,
লাগিয়ে বুকে ঢেউয়ের ঝাপট পেইছি যা’ তা’ এই গো এই!

যৌবনের আজ জন্মতিথি—জগৎ জুড়ে উন্মাদন!
উল্টো হাওয়ার দুই টানাতে শিউরে ওঠে ফুলের বন;
ঝরিয়ে দিয়ে ফুটিয়ে তুলে
জীবন-মরণ দোলায় দুলে
গানগুলি ওই চরণমূলে দিলাম গো সৰ্ব্বস্ব ধন।

আজ আমি নিশ্চিন্ত হ’লাম তোমায় সঁপে সবখানি
বাঁশীর কটা ফুটার ফাঁকে ফুরিয়ে ফুঁকে সব গানই;
এই নে ভক্তি এই নে শ্রদ্ধা
এই নে শক্তি এবং স্পর্ধা
বাছাই যাচাই তোমার কাছেই খুব জানি গো খুব জানি।

সাজতে ভালবাসিস্ যে তুই ভিতর-প্রাণের ভাব নিয়ে
সকল-সঁপা ক্ষেপার এ গান—চাস্নে কি তুই আপনি এ?
নিয়ে আমার প্রাণের স্পন্দ
গড়িস্ যে তুই নূতন ছন্দ
হ’স যে রঙীন্ আমার মনের ছোপ নিয়ে আর ছাপ নিয়ে।

শুভ্র তোমার অঙ্গবিভা অগাধ শূন্যে মূর্চ্ছা পায়,
রঙীন্ সে হয় তবেই যবে অশ্রু আমার কুল ছাপায়;
মলিন ধরার ধূলাবালি
আলোয় ক’রে দ্যায় সোনালি
তাই তো অভ্র-আবীর ডালি তোমার অমল কমল পায়।

এই নে আমার অঞ্জলি গো এই নে আমার অঞ্জলি,
বীণায় যে গান ধরেছিলাম হয় তো এ তার শেষ কলি;
“আবির্” “আবির্” মন্ত্র-রাবে
কর্ গো সফল আবির্ভাবে
অশ্রু-হাসির অভ্র আবীর আঁখির আলোয় উজ্জলি’।