রাজাকারদের সময়

একাত্তর ছিলো মুক্তিযােদ্ধাদের সময়; আর এটা রাজাকারদের সময়। মাত্র একটি বছর ছিলাে মুক্তিযােদ্ধাদের; পুরাে দেড়টি দশক দখল ক’রে আছে রাজাকাররা। একাত্তরে রাজাকার ছিলো, খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাে; কারণ সে-সময়টা ছিলাে মুক্তিযোদ্ধাদের। একাত্তরে এতাে রাজাকার ছিলাে না। এখন এতাে রাজাকার; কেননা মুক্তিযােদ্ধারা নেই। যারা আছে, তারা ভয়ে ভয়ে আছে। এটা রাজাকারদের কাল; তাই তারা ভয় পায় না ভয় দেখায়। রাজাকার, আর মুক্তিযােদ্ধা শুধু ব্যক্তি নয়; তারা দুটি বিপরীত আদর্শ। প্রগতি, মুক্তি, স্বাধীনতা, কল্যাণের নাম মুক্তিযােদ্ধা; প্রতিক্রিয়াশীলতা, অধীনতা, মধ্যযুগীয় বর্বরতা, মনুষ্যত্বশূন্যতার নাম রাজাকার। রাজাকার হওয়া সহজ, কঠিন মুক্তিযােদ্ধা হওয়া। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলে কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয় না, মুক্তিযােদ্ধা হওয়ার জন্যে অপরিহার্য প্রগতি, মুক্তি, স্বাধীনতা, কল্যাণে অটল, আপোষহীন বিশ্বাস। একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার; কিন্তু একবার মুক্তিযােদ্ধা মানেই চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।

যে-মুক্তিযােদ্ধা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে আদর্শে, সে আর মুক্তিযােদ্ধা থাকে না, হয়ে ওঠে রাজাকার। বাঙলাদেশে হয়েছে তাই।

রাজাকারেরা এখন অধিকার ক’রে আছে সবকিছু। একাত্তরে প্রতিক্রিয়াশীলতা ছিলাে না, মধ্যযুগে ফেরার ইচ্ছে ছিলো না; স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিলাে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও মধ্যযুগের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ। এখন যেখানে যাই, যে-দিকে তাকাই, দেখি বসে আছে রাজাকাররা। রাজনীতি দখল করে আছে তারা, কোনাে কোনাে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দখলে, বিচিত্র ধরনের সংঘ এখন তাদের অধিকারে! পত্রপত্রিকার একটি বড়াে অংশ তারা দখল করেছে, এমনকি সাহিত্যেও রাজাকাররা এখন সক্রিয় । বাঙলার বস্তুজগত তাদের অধিকারে চ’লে গেছে, এখন জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার এলাকাটিও দখল ক’রে সেখানে প্রতিক্রিয়াশীলতা স্থায়ী করতে চায় তারা। কিছু কিছু পত্রপত্রিকা ও বইপত্র পড়লেই বুঝি ওগুলাে রাজাকারের ছুরিতে লেখা। ওসব লেখায় ভরা থাকে মধ্যযুগীয় বিষ, মনুষ্যত্ব বিরােধিতা, প্রগতিহনন ও অন্ধকার যুগের পরিকল্পনা। বহু মুক্তিযােদ্ধা দেড় দশকে দীক্ষা নিয়েছে রাজাকারদের কাছে। রাজাকাররা এখন স্থির করে রাষ্ট্রের কাঠামাে, দূষিত করে সংবিধান, তৈরি করে সংস্কৃতির কাঠামাে, এমন কি মুক্তিযুদ্ধের মূলবাণীও ব্যাখ্যা করে তারা। একাত্তরে এমন ছিলাে না। রাজাকারদের দখলে ছিলাে কয়েকটি ভবন, রাস্তা ও এলাকা ও কয়েকটি পত্রিকা। এর বেশি কিছু তারা দখল করতে পারেনি। এখন তারা দখল করেছে সব। বাস্তব জগতটি তারা দখল করেছে, এটা খুবই মারাত্মক; তবে এর চেয়েও ভয়াবহ হচ্ছে তারা অবাস্তব জগতটি; – আমাদের স্বপ্ন, কামনা, সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার এলাকাটিও দখল করতে যাচ্ছে। বাঙলাদেশের বাস্তবতা ও স্বপ্নলােক জুড়ে সারাক্ষণ কাজ করে চলছে রাজাকাররা। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা নেই। এ-দুঃসময়ে চিৎকার ক’রে উঠতে ইচ্ছে করে: চারপাশে রাজাকার, মুক্তিযােদ্ধারা তােমরা কোথায়?

মুক্তিযােদ্ধারা যা কিছু অর্জন করেছিলাে, তার সব কিছুই বর্জন করেছে রাজাকাররা। গণতন্ত্র সংশােধিত হয়েছে। সমাজতন্ত্র বাতিল হয়েছে পুরােপুরি; কারণ তা রাজাকারতন্ত্রের প্রধান শত্রু। রাজাকার মানুষে মানুষে সাম্যের কথা ভাবতে পারে না, ভাবতে পারে না ধনসাম্যের কথা। রাজাকার বৈষম্য চায়, নিজে চায় সস্পদ অন্যকে প্রতারণা ক’রে। ধর্মনিরপেক্ষতা রাজাকারের আরেক বড়ো শত্রু। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতা মানবিক। রাজাকার প্রকৃত ধর্মও চায় না, চায় ধর্মান্ধতা; চায় ধর্মের নামে শােষণপীড়ন। রাজাকার সব রকমে স্বাধীনাতার বিরােধী। রাজাকার বিরােধী ব্যক্তি, শ্রেণী, নারী, বাকস্বাধীনতার। রাজাকার ধর্মের অতীন্দ্রিয় আবেগে আলােড়িত হয় না; তার প্রিয় ধর্মের প্রথা, কারণ প্রথা দিয়ে সে অন্যকে পীড়ন করতে পারে। রাজাকার যুক্তির বিরােধী, নতুন সৃষ্টির বিরােধী। এখন রাজাকারদের কাল; বাঙলাদেশের ইতিহাসে এখন চলছে রাজাকারপর্ব। শহুরে কোণায় কোণায় এখন প্রগতিবিরােধিতা।

পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় এখন রাজাকারের জিব থেকে ছড়ানাে বিষ। এখন প্রগতির কথা বলা কঠিন, প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব, সত্য উচ্চারণ আত্মহত্যার সমান; কিন্তু এখন চারপাশে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয় অসংখ্য অশ্লীল কথা। মনুষ্যবিরােধিতা ছাপা হয় এখন পত্রিকার পাতা জুড়ে, প্রগতির বিরুদ্ধে অশ্লীল গালাগাল প্রতিদিন মুদ্রিত হয়, বিজ্ঞানবিরােধিতা টেলিভিশন থেকে পাড়ার মাইক্রোফোনে প্রচারিত হয় বেলায় বেলায়। রাজাকার ও রাজাকারবাদ দ্বারা পুরােপুরি পর্যদুস্ত আশির দশক।

এ-সময়ে মুক্তিযােদ্ধাদের ফিরে আসা দরকার। প্রগতিশীল রাজনীতিই পারে তাদের ফিরিয়ে আনতে। একাত্তরের মুক্তিযােদ্ধাদের তো ফিরতেই হবে; এর সাথে আসতে হবে নতুন কালের মুক্তিযােদ্ধাদের, যারা বিশ্বাস করে স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ইহজাগতিকতা, প্রগতিশীলতায়। বিশ্বাসের জন্যে বিশেষ জলবায়ু দরকার। রাজাকারি জলবায়ুতে কিশাের-তরুণেরা হয়ে উঠবে রাজাকার; তার চারপাশে যা শুনবে, পড়বে দেখবে তাই হয়ে উঠবে। দূষিত জলবায়ু থেকে দূষিত খাদ্য সংগ্রহ ক’রে হয়ে উঠবে তারা দূষিত মধ্যযুগীয় মানুষ। তাই তাদের জন্যে প্রগতিশীল পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যাতে নিঃশ্বাসে তারা যা গ্রহণ করে, তাই তাদের ক’রে তোলে প্রগতিশীল। তাদের জন্য প্রগতিশীল জলবায়ু সৃষ্টি করা খুব জরুরি ও বেশ কঠিন। নতুন প্রজন্মের কাছে অবিরাম প্রগতিশীলতা পৌছে দেয়া সহজ হয়। আমরা এমন কোনাে সংঘ তৈরি করতে পারি নি, যা ওই দায়িত্ব পালন করবে। তবে প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকারি পরিবেশ তাদের ভেতরে ঢুকছে প্রতিদিন। পাঠ্যপুস্তকে তারা পড়ছে প্রতিক্রিয়াশীল অপপাঠ; পত্রপত্রিকায় পড়ছে দূষিত প্রবন্ধ-সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়; বেতার-টেলিভিশনে শুনছে অশ্লীল প্রতিক্রিয়াশীল বাণী। রাজাকারদের গলার স্বর পৌঁছে যাচ্ছে দেশেন দূরতম প্রান্তে কিশােরটির কানে; রাজাকারদের জীবাণুগ্রস্ত বাক্য প্রগতিবিরােধী পত্রপত্রিকা ভর ক’রে উপস্থিত হচ্ছে টেবিলে। তারা আক্রান্ত হয়ে আছে প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকারি জলবায়ু দিয়ে। তাই নতুন প্রজম্মকে উদ্ধার করতে হবে এ- অবস্থা থেকে। যদি তাদের উদ্ধার করা যায়, তবে দেখা দেবে মুক্তিযােদ্ধা ও প্রগতিশীলতা; নইলে রাজাকারের অপআদর্শ দিয়ে পর্যদুস্ত হবে বাঙলাদেশ। আমাদের বর্তমান রাজাকারদের দখলে; ভবিষ্যৎও কি থাকবে রাজাকারদের দখলে?